চুল পড়া রোধ করুন এবং আপনার চুলকে আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত করার কিছু ঘরোয়া টিপস

0
146
চুল পড়া রোধ করুন এবং আপনার চুলকে আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত করার কিছু ঘরোয়া টিপস

চুল সবার কাছেই খুব প্রিয়। চুল ছাড়া সৌন্দর্যের কথা ভাবাই যায় না। ঘন, কালো, স্বাস্থ্যবান চুল ছেলে হোক আর মেয়ে সবারই কাম্য। চুল লম্বা হোক অথবা ছোট তা হতে হবে অবশ্যই তরতাজা। দেখলে যাতে সবাই বলে, “ওয়াও”।

চুল পড়া একটা সাধারণ ব্যাপার। যদি অতিরিক্ত চুল পড়ে তবে তা চিন্তার কারন হয়ে দাড়ায়। দৈনিক ৫০-১০০ টা চুল পড়া স্বাভাবিক কিন্তু এর বেশি হলেই সমস্যা। ছেলে হোক আর মেয়ে সবাই চুল পড়ার সমস্যায় ভুগে। বর্তমানে চুল পড়ার সমস্যা এতটা প্রকট আকার ধারণ করেছে যে চুল পাতলা হতে হতে টাকের সৃষ্টি হচ্ছে। অনেকেই আছে যারা এরকম সমস্যায় ভুগছে। এরকম সমস্যা অনেক সময় আপনি বুঝতেই পারবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত না আপনি অনেকটা চুল হারিয়ে ফেলেছেন।

চুল পড়ার কারনঃ

চুল পড়া সাধারণ একটা ব্যাপার কিন্তু অতিরিক্ত চুল পড়া সাধারণ ব্যাপার কখনোই হতে পারে না। আর সেই সাথে যদি নতুন চুল না গজায় তাহলে তো ব্যাপারটা আরো ভয়াবহ হয়ে দাড়ায়। চুল বিভিন্ন কারনে পড়তে পারে চুল পড়ার কিছু কারন তুলে ধরার চেষ্টা করলামঃ-

  • অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় অনেক সময় চুল ঝরতে থাকে। অনেক সময় চুল পড়ার কারনে দুশ্চিন্তা করতে করতে আরো বেশি চুল পড়ে।
  • অ্যান্ড্রোজেনিক হরমোনের প্রভাবে চুল পড়া বেড়ে যায়। এই হরমোনের প্রভাব যাদের শরীরে বেশী, তাদের চুল বেশি পড়ে। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় অনেক সময় চুল ঝরতে থাকে। অনেক সময় চুল পড়ার কারনে দুশ্চিন্তা করতে করতে আরো বেশি চুল পড়ে।
  • ছত্রাক ও খুশকির সংক্রমণের কারনে চুল পড়া বেড়ে যায়। এটা চুল পড়ার অন্যতম কারন।
  • পুষ্টির অভাবের কারনে চুল পড়া বেড়ে যায়। ৬ টি উপাদান, আমিষ, চর্বি, পানি, ভিটামিন, খনিজ লবন, শর্করা এগুলোর সবগুলোর অভাবের কারনে অথবা যেকোন একটির অভাবের কারনে চুল পড়া বেড়ে যায়।
  • নারীরা জন্মনিরোধক পিল খেলে, গর্ভাবস্থায়, অথবা মনোপজের সময় চুল পড়ার সমস্যায় ভুগে।
  • চুলে অতিরিক্ত প্রসাধনী যেমন- শ্যাম্পু, হেয়ার কালার ইত্যাদি ব্যবহারের কারনে চুল পড়ার সমস্যা বেড়ে যায়। চুল স্ট্রেইট করলে বা হেয়ার রিবন্ডিং করলেও চুল পড়ে যায়। এক্ষেত্রে অনেক সময় চিকিৎসা করলেও চুল আর আগের অবস্থায় ফিরে আসে না।
  • চুল অনেক বেশি টাইট করে বাঁধলে বা ভেজা চুল আঁচড়ালে চুল পড়া বেড়ে যায়।
  • ক্যান্সার এর কারনে কেমোথেরাপি করার জন্য মাথর চুল সব ঝড়ে পড়ে যায়। এছাড়াও কিছু রোগ যেমন- থাইরয়েড, ডায়বেটিস, টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া, জন্ডিস এর প্রভাবে চুল পড়ে যেতে পারে। 
  • অনেক সময় ঔষধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার কারণেও চুল পড়ে যায়।

চুল পড়া বন্ধে প্রাকৃতিক সমাধানঃ

চুল পড়া থেকে মুক্তির জন্য অনেকেই বিভিন্ন বিজ্ঞাপন দেখে বিশ্বাস করে অনেক ধরনের তেল, শ্যাম্পু, কন্ডিশনার ব্যবহার করে থাকে। যা হীতে আরো বিপরীত হয়ে যায়। তাই ভেবে, বুঝে তারপরই কোন কিছু ব্যবহার করার চেষ্টা করবেন। চুল পড়া বন্ধে ও নতুন চুল গজানোর জন্য ঘরোয়া কিছু সমাধান আছে যা ব্যবহারে উপকার হবে কিন্তু কোন ক্ষতি হবে না।

আমি আপনাদের কাছে এরকমই কিছু ঘরোয়া টিপস নিয়ে এলাম যা আপনার চুলকে করবে আকর্ষণীয় ও প্রাণবন্ত।

১. পেয়াজের রসঃ

পেয়াজের রস চুল পড়া বন্ধে কার্যকরি সমাধান দেয়। যে ব্যবহার করেছে সেই বুঝতে পারে পেয়াজের রস শুধু চুল পড়া ই বন্ধ করে না বরং নতুন চুল গজাতেও সাহায্য করে। পেয়াজে আছে উচ্চ মাত্রায় সালফার। এর ব্যবহারে মাথার ত্বকে রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি করে। ১ মাস যদি নিয়ম করে পেয়াজের রস ব্যবহার করা হয় তবে অবশ্যই একটা ভালো ফলাফল পাওয়া যাবে।

ব্যবহারের নিয়মঃ

একটা বড় পেয়াজ রস করে পরিস্কার একটি পাত্রে নিতে হবে। তারপর তুলোর সাহায্যে রস টা ভালো করে মাথার ত্বকে লাগাতে হবে। বেশি জোড়ে ম্যাসাজ করা যাবে না। চাইলে পেয়াজের রসের সাথে গোলাপ জল মিশাতে পারেন এতে করে পেয়াজের গন্ধ কিছুটা কমে যাবে। তারপর ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘন্টা রেখে দিবেন। তারপর ঠান্ডা পানি দিয়ে মাথা ভালো করে ধুয়ে নিবেন। তারপর ভালো মানের শ্যাম্পু দিয়ে চুল পরিস্কার করে নিবেন। প্রয়োজন অনুযায়ী সপ্তাহে ২ থেকে ৩ বার পেয়াজের রস ব্যবহার করা যাবে।

২. মেহেদীঃ

মেহেদী চুলের রঙের সাথে সাথে চুলের স্বাস্থ্য রক্ষায় ও অনেক কার্যকর। এটিতে অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল এবং অ্যাস্ট্রিজেন্ট আছে যা মাথার ত্বকের থেকে অতিরিক্ত তেল দূর করে, ও জমাট বাঁধা রোধ করে। নিয়মিত মেহেদী ব্যবহারে চুল সুন্দর হওয়ার সাথে সাথে চুল পড়াও রোধ করে।

ব্যবহারের নিয়মঃ

মেহেদী পাতা ভালো করে বেটে এর সাথে ডিমের সাদা অংশ আর ২-৩ টেবিল চামচ টক দই মিশিয়ে ভালো করে পেস্ট তৈরি করে নিতে হবে। পেস্ট টি ভালো করে মাথায় লাগান ১ থেকে ১.৩০ ঘন্টা অপেক্ষা করুন। তারপর ঠান্ডা পানি দিয়ে ভালো করে ধুয়ে নিন। ১ দিন পর শ্যম্পু করে ভালো ভাবে ধুয়ে নিন। সাথে সাথে শ্যম্পু লাগানো যাবে না এতে করে মেহেদীর পুরো পুষ্টি চুলে পৌছাবে না। সপ্তাহে ১ দিন এই প্যাকটি ব্যবহার করলেই হবে।

৩. নিম পাতাঃ

চুলের পুষ্টি রক্ষায় ও চুল পড়া কমাতে নিম পাতার কার্যকারিতা অনেক। নিম পাতা চুল পড়া কমানোর সাথে সাথে চুলকে করে তোলে নরম, কোমল ও মসৃণ। সেই সাথে মাথার ত্বকের জ্বালা কমায় এবং ত্বকের শুষ্কতা দূর করে।

ব্যবহার নিয়মঃ

নিম পাতা ভালো করে ধুয়ে বেটে চুলে লাগাতে পারেন। ১ ঘন্টা রেখে  শ্যাম্পু করে ধুয়ে ফেলুন। এছাড়া মধু ও নিম পাতার রস ভালো করে মিশিয়ে মাথার চুলের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত লাগিয়ে ২০-৩০ মিনিট রেখে দিন। তারপর শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে ২-৩ দিন নিম পাতা ব্যবহার করতে পারেন।

৪. নারিকেলের দুধঃ

নারিকেলের দুধ চুল পড়া রোধ করে সেই সাথে চুলে ডিপ ময়েশ্চারাইজার হিসেবেও কাজ করে। চুলের পুষ্টি রক্ষায় নারিকেল দুধের বিকল্প নেই।

Coconut milk in the glass

ব্যবহার নিয়মঃ

নারিকেল ভালো করে কুড়িয়ে নিন। তারপর নারিকেল পিষে একটা পাতলা কাপড়ে নিয়ে ভালো করে চিপে দুধ বের করে নিন। তারপর সেই দুধ চুলের গোড়ায় ভালো করে হাত ম্যাসাজ করে লাগান।

চুল বেশি পড়লে প্রতিদিন লাগাতে পারেন। তবে নিয়ম করে সপ্তাহে ২-৩ বার লাগালেও উপকার পাবেন।

৫. আমলকি

চুল পড়া রোধে আমলকি অনেক ভালো কাজ করে। আমলকিতে আছে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন সি যা চুল পড়ার অন্যতম কারন। তাই প্রতিদিন আমলকি খেলে যেমন শরীরে ভিটামিন সি এর ঘাটতি দূর হবে সেই সাথে চুল পড়াও কমবে এবং মুখে রুচি বাড়বে।

ব্যবহার নিয়মঃ

আমলকি খেলে ও চুল পড়া কমবে। তাছাড়া আমলকির রস বের করে তেলের সাথে মিশিয়ে মাথায় লাগালেও চুল পড়া রোধ হবে ও মাথার খুশকি কমে যাবে।

৬. বীটরুট রসঃ

বীটরুটের সাথে আমরা অনেকেই পরিচিত আবার অনেকেই নই। বীটরুট এমন একটা কার্যকর উপাদান যাতে রয়েছে, প্রোটিন, ফসফরাস, পটাসিয়াম, ভিটামিন সি ও ভিটামিন বি। বীটরুট চুল পড়া কমানোর সাথে নতুন চুল গজাতেও সাহায্য করে। চুলের সৌন্দর্য বাড়ায় এর মাধ্যমে চুলে ন্যাচারাল একটা কালার আসে।

ব্যবহার নিয়মঃ

বীটরুট ভালো করে বেটে তার রস তৈরি করুন। তারপর ভালো করে জাল দিয়ে ঘন করে নিন। তারপর চুলে লাগান ও মাথার তালুতে। চাইলে এর সাথে হালকা মেহেদী ও ব্যবহার করতে পারেন। তারপর ৩০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন।

৭. হট ওয়েল ম্যাসাজঃ

নারিকেল তেল বা বাদামের তেল গরম করে চুলে লাগালে অনেক উপকার পাওয়া যায়। গরম তেল মাথার ত্বকে রক্ত সঞ্চালন বাড়ায় সেই সাথে চুলের পুষ্টি ও বাড়াতে সাহায্য করে।

ব্যবহার নিয়মঃ

নারিকেল তেল বা বাদাম তেল গরম করে দুই হাতের তালুতে নিয়ে ভালো করে চুলের গোড়ায় মালিশ করে নিন। বেশি জোড়ে না হালকা হালকা ভাবে মালিশ করবেন। নিয়মিত ব্যবহারে পার্থক্য আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন।

৮. মেথিঃ

চুল পড়া রোধে মেথি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মেথিতে রয়েছে প্রচুর পরিমানে প্রোটিন ও নিকোটিন এসিড যা চুলে পুষ্টি যোগাতে সাহায্য করে।সেই সাথে মেথি ওজন কমাতেও সাহায্য করে।

ব্যবহার নিয়মঃ

মেথি সারারাত ভিজিয়ে রেখে সেই পানি ছেঁকে সকালে ওঠে খালি পেটে পান করুন। বাকি বেঁচে যাওয়া পানি হাতে নিয়ে মাথায় ম্যাসাজ করুন। প্রতিদিন মেথি ভেজানো পানি খেলে চুল পড়া কমবে সাথে ওজন ও।

তাছাড়া ভিজিয়ে রাখা মেথি দানা বেঁটে চুলের গোড়ায় লাগাতে পারেন এতে করেও অনেক উপকার পাওয়া যায়।

৯. অ্যালোভেরাঃ

অ্যালোভেরাতে রয়েছে প্রচুর পরিমানে এনজাইম যা চুলের বৃদ্ধি ঘটায়। এর ব্যবহারে চুল পড়লেও নতুন চুল গজাবে।

ব্যবহার নিয়মঃ

অ্যালোভেরা জেল নিয়ে মাথার ত্বকে লাগিয়ে কয়েক ঘন্টা অপেক্ষা করুন। তারপর হালকা গরম পানিতে মাথা ভালো করে ধুয়ে ফেলুন। আর দেখুন এর কার্যকারিতা। সপ্তাহে ২-৩ বার এই জেল ব্যবহার করতে পারেন।

১০. শ্যাম্পুঃ

শ্যাম্পু অবশ্যই ভালো মানের ব্যবহার করতে হবে। পারলে হারবাল শ্যাম্পু ব্যবহার করবেন। শ্যাম্পু সঠিক ভাবে ব্যবহারের ফলে চুল পড়া অনেক কমে যায়। অনেক সময় অনেক শ্যাম্পুর বিজ্ঞাপন দেখানো হয় যা দেখলে মনে হয় এর চেয়ে ভালো কিছু হতেই পারে না। তাই বিজ্ঞাপন এ বিশ্বাস না করে নিজের চুলের ধরন অনুযায়ী শ্যাম্পু বাছাই করুন।

ব্যবহারের নিয়মঃ

সবসময় শ্যাম্পু ব্যবহারের সময় চুল ভালো করে ঠান্ডা পানিতে ভিজিয়ে নিবেন। তারপর দুই হাতের তালুতে শ্যাম্পু নিয়ে একটু পানি দিয়ে হালকা ঘষে ফেনা করে নিবেন। তারপর তা মাথায় লাগাবেন, আলতো করে ম্যাসাজ করে পুরো মাথায় ও চুলে শ্যাম্পু লাগাবেন। ভালো করে ফেনা তুলে তারপর ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলবেন। চাইলে শ্যাম্পু করার পর ভালো মানের কন্ডিশনার মাথায় লাগিয়ে নিতে পারেন যা চুলকে আরো মজবুত ও সুন্দর করে তুলবে।

একদিন পর পর শ্যাম্পু করতে পারেন চুলের ধরন অনুযায়ী। আর তা না হলে সপ্তাহে ৩ বার শ্যাম্পু ব্যবহার করবেন।

চুলের যত্নে একটু ও ছাড় দেয়া উচিৎ নয়। সবসময় চুলের প্রতি সবারই যত্নশীল হওয়া উচিৎ। সবার  চুলের ধরন এক নয় তাই সব উপাদান সবার কাজে নাও লাগতে পারে। তবে একটু যাচাই করে আপনিও পেয়ে যেতে পারেন আপনার কাঙ্ক্ষিত উপাদান যা আপনার চুল পড়ার রোধের সাথে সাথে আপনার চুলকে করে তুলবে আকর্ষণীয় ও সুন্দর।