ব্রণ কী? কেন হয়, চিকিৎসা ও প্রতিকার

0
117

বয়ঃসন্ধি কালে কিশোর কিশোরীদের ব্রণ হওয়াটা স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। এই সময় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে সাধারণত ব্রণ হয়ে থাকে। আবার একটা নির্দিষ্ট সময়ে ব্রণ ঠিক ও হয়ে যায়।

কিন্তু এমন কিছু ব্রণ আছে যা ঠিক হয় না আবার অনেকের অন্যান্য অনেক কারণেও ব্রণ হয়ে থাকে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে বেশিরভাগ মানুষেরই ব্রণ সাধারণত ১১ থেকে ৩০ বছর বয়সের মধ্যে হয়ে থাকে। আবার অনেকের ৩০ বছরের পরেও ব্রণ হয়ে থাকে। মানুষের মুখে, পিঠে, বুকে এই ব্রণ দেখা দেয়। অনেকে চিন্তাগ্রস্ত হয়ে বিভিন্ন প্রসাধনীর ব্যবহার শুরু করে যার ফলে অনেক ক্ষেত্রে ব্রণ চলে যায় আবার অনেক ব্রণ চলে গেলেও একটা বিশ্রী দাগ বা গর্ত রয়ে যায়, আবার অনেক সময় ব্রণের প্রকোপ আরো বেড়েও যেতে পারে।

চলুন আমরা আগে জেনে নেই

  • ব্রণ কী,
  • ব্রণ কেন হয়,
  • ব্রণের চিকিৎসা,
  • প্রতিকার কীভাবে সম্ভব,
  • কিছু প্রাকৃতিক উপাদানের নাম।

ব্রণঃ

ব্রণ একটি চর্মরোগ। হরমোনের তারতম্যের কারণে সাধারণত ব্রণ হয়ে থাকে। বয়ঃসন্ধি কালে ব্রণ বেশি হয়। আবার অনেকের জেনেটিক কারণেও ব্রণ হয়ে থাকে।

ব্রণের ধরণঃ

ব্রণ অনেক ধরণের হয়ে থাকে। যেমন,

★. একনি কসমেটিকাঃ প্রসাধনী বেশি পরিমানে ব্যবহারের ফলে অনেক সময় মুখে অল্প পরিমাণে ব্রণ হতে পারে যা একনি কসমেটিকা নামে পরিচিত।

★. একনি ডিটারজিনেকসঃ অনেকের সাবান দিয়ে একাধিক বার মুখ ধোয়ার কারণে ব্রণ হয়ে থাকে এবং ব্রণের সংখ্যা বাড়তেও থাকে।

★. ট্রপিক্যাল একনিঃ অতিরিক্ত গরম বা আদ্র বাতাসের কারণে পিঠে বা উরুতে ব্রণ হয়ে থাকে।

★. স্টেরয়েড একনিঃ অতিরিক্ত ঔষধ সেবনের কারণে অনেক সময় ব্রণের সৃষ্টি হয়।

★. প্রিমেন্সট্রুয়াল একনিঃ অনেক মহিলার মাসিক শুরুর সপ্তাহ খানেক আগেও মুখে ব্রণ হয়ে থাকে।

★. অন্যান্যঃ অন্যান্য অনেক ধরণের ব্রণ হয়ে থাকে। যেমন, গর্ভকালীন সময়ে অনেক সময় মহিলাদের ব্রণ হয়ে থাকে।

ব্রণ হওয়ার স্থানঃ

ব্রণ সাধারণত শরীরের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় হয়ে থাকে। যেমন,

  •  মুখের ব্রণ
  •  মধ্যদেহে ব্রণ
  •  বুক এবং ঘাড়ে বিস্তীর্ণ ব্রণ।

ব্রণ হওয়ার কারণঃ

আমাদের দেহে সিবেসিয়াস গ্রন্থী থাকে। এই গ্রন্থী থেকে একধরনের তৈলাক্ত পদার্থ বের হয়। এর মাধ্যমে শরীরের বর্জ্য পদার্থ বের হয়ে যায়। লোমকূপ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে আর আর এই পদার্থ বের হতে পারে না। ফলে ত্বকের ভিতর থেকে ব্রণের সৃষ্টি হয়। এটি হলো ব্রণের অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়াও কিছু কারণ আছে। যেমন,

১. বয়ঃসন্ধি কালে হরমোনের বৃদ্ধির কারণে ব্রণ হয়ে থাকে। মেয়ে বা ছেলে সবারই ব্রণ হয় এসময়।

২. বংশগত কারণেও ব্রণ হতে পারে। অর্থাৎ বংশের লোকেদের যদি ব্রণ হয় তবে অন্যান্যদেরও হতে পারে।

৩. অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপের কারণেও ব্রণ হয়ে থাকে।

৪. কিছু কিছু ব্যকটেরিয়া জনিত কারণেও ত্বকে ব্রণ হতে পারে।

৫. অতিরিক্ত প্রসাধনী ব্যবহারের কারণেও ত্বকে ব্রণ হয়ে থাকে।

৬. ঠিকমতো ত্বক পরিস্কার না করলেও ব্রণের সৃষ্টি হতে পারে।

৭. গর্ভকালীন সময়ে অনেক মায়েদের ব্রণের সমস্যা দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে তা আবার ঠিক ও হয়ে যায়।

৮. পরিমাণ মতো না ঘুমালে অর্থাৎ দৈনিক কম ঘুমালে ও ত্বকে ব্রণ হতে পারে।

৯. কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে বা পেটের সমস্যা থাকলেও অনেকের ব্রণ হয়।

১০. জন্মনিরোধক বড়ি খাওয়ার কারণেও ত্বকে ব্রণ হয়।

রোগ নির্ণয় পদ্ধতিঃ

ব্রণের মাত্রা বা পরিমাণ নির্ণয়ের কিছু পদ্ধতি আছে। যেমন,

লিডস গ্রীডিংঃ

সংক্রমণতা ও অসংক্রমণতার মাত্রা কতটুকু তা নির্ধারণ করে থাকে এই পদ্ধতির মাধ্যমে।

কুকস গ্রেডিং স্কেলঃ

এই পদ্ধতিতে ছবি ব্যবহার করে ব্রণের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়।

পিলসবারি স্কেলঃ

এই পদ্ধতিতে ব্রণের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়। সাধারণত মাত্রা ১ হলে সবচেয়ে কম আর মাত্রা ৪ হলে সবচেয়ে বেশি।

চিকিৎসা পদ্ধতিঃ

ব্রণ দেখা দিলে হেলাফেলা না করে অথবা উল্টা পাল্টা প্রসাধনী ব্যবহার না করে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ সেবন করলে ব্রণ ভালো হয়ে যায়। আবার অনেক ঔষধ আছে ব্রণে লাগালেও ব্রণ ও তার দাগ ভালো হয়ে যায়। এছাড়াও আজকাল লেজার পদ্ধতির মাধ্যমে ব্রণের দাগ বা গর্ত অনেকাংশে নিরাময় করা সম্ভব হয়। ব্রণের চিকিৎসায় আধুনিক কিছু পদ্ধতির নাম হলো,

১. একনি গো ডিভাইস

২. ডক্টর লাইট

৩. Retinol serum

৪. ডায়মন্ড পিলিং

এসব পদ্ধতিতে ব্রণ ও তার কালো দাগ দূর করা সম্ভব।

প্রতিকারঃ

ব্রণ হলে দুশ্চিন্তার কোন অন্ত থাকে না। এজন্য অনেকের ব্রণ সারতেই চায় না। ব্রণ হলে দুশ্চিন্তা না করে কীভাবে তা দূর করা যায় তা ভাবতে হবে। কিছু কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করলে ব্রণ অনেকটাই ভলো হয়ে যায়। তা নিয়ে আলোচনা করা হলো,

১. যাদের অতিরিক্ত তৈলাক্ত ত্বক তারা অবশ্যই ওয়েল কন্ট্রোল ফেস ওয়াস ব্যবহার করবেন। সবচেয়ে ভালো হয় যদি নিম ফেসওয়াস ব্যবহার করা যায়। এটা ব্রণের বিরুদ্ধে অনেক কাজ করে।

২. প্রতিদিন নিয়ম করে ৮ থেকে ১০ গ্লাস পানি পান করতে হবে। মনে রাখবেন পানির বিকল্প কিছু নেই। পানি শরীরের অনেক রোগ প্রতিরোধ করতে সক্ষম।

৩. নিয়ম করে পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে হবে। কম ঘুম শরীরের জন্য ক্ষতিকর তাই অবশ্যই চেষ্টা করবেন দৈনিক ৮ ঘন্টা ঘুমাতে।

৪. ব্যয়াম করা শরীরের জন্য অনেক ভালো। ব্যয়াম করলে শরীরের বর্জ্য গুলো ঘামের মাধ্যমে বের হয়ে যায়। তাই নিয়ম করে দৈনিক ২ বেলা ব্যয়াম করবেন।

৫. পুষ্টিকর খাবার খাবেন। প্রচুর পরিমানে সবুজ শাক সবজি খাবেন।

৬. ধূমপান, মদ্যপান থেকে বিরত থাকবেন।

৭. সপ্তাহে ২ বার স্ক্রাবিং করার চেষ্টা করবেন। এতে করে ত্বকের মৃত কোষ গুলো দূর হবে।

৮. মেকাপ যথাসম্ভব কম ব্যবহার করুন। আর মেকাপ উঠানোর জন্য ভালো মানের রিমুভার ব্যবহার করুন।

৯. চুল নিয়মিত পরিস্কার করুন। কারণ চুলের খুশকি ব্রণের কারণ হতে পারে।

১০. চিন্তা মুক্ত থাকার চেষ্টা করুন।

১১. মুখে বার বার হাত দিবেন না। আর ব্রণ কখনো হাত বা নখ দিয়ে খুটাবেন না।

১২. কোষ্টকাঠিন্য দূর করার চেষ্টা করুন। এজন্য ভিটামিন ও প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার চেষ্টা করবেন।

১৩. পরিস্কার পোশাক পড়ুন আর পরিস্কার থাকার চেষ্টা করুন।

১৪. বালিশে কভার পরিবর্তন করুন কয়েকদিন পর পর। কারণ বালিশের কাভারে থাকা জীবাণু অনেক সময় মুখের ব্রণের সৃষ্টি করে।

ব্রণ দূর করা ঘরোয়া পদ্ধতিঃ

ব্রণ দূর করার জন্য কিছু ঘরোয়া প্রাকৃতিক উপাদান আছে এগুলো নিয়ম করে ব্যবহার করলে ব্রণ ভালো হয়ে যায়। কিছু প্রাকৃতিক উপাদানের নাম দেয়া হলো,

★ লেবুর রস ব্রণের জন্য উপকারী। লেবুর রস ব্রণের উপর সারারাত লাগিয়ে সকালে ধুয়ে ফেলুন ব্রণ ভালো হয়ে যাবে।

★ টমেটো টুকরো করে কেটে ব্রণের উপর ঘষুন। এটি ত্বকে ব্রণের ছত্রাক মেরে ফেলে।

★ রসুনের রস নিয়ে ব্রণে লাগান। শুকিয়ে গেলে ধুয়ে ফেলুন। রসুনের রস জীবাণু ধ্বংস করে ব্রণের পরিমাণ কমিয়ে দেয়।

★ বরফ ব্রণের দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখে। ব্রণের উপর বরফ একটা সুতি কাপরে নিয়ে ঘষুন। এতে করে ব্রণের ফোলাভাব কমে যাবে।

★ গোলাপ জল নিয়মিত ব্যবহারেও ব্রণের দাগ কমে যায়। দারুচিনির গুরার সাথে গোলাপ জল মিশিয়ে মুখে লাগান। শুকিয়ে গেলে ধুয়ে ফেলুন। দেখবেন ব্রণের জন্য কতটা উপকারি।

★ ডিমের সাদা অংশ পুরো মুখে ও ব্রণ আক্রান্ত জায়গায় লাগান ৩০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। এতে করে ব্রণ কমে যাবে।

এছাড়াও আরো অনেক উপাদান আছে যা নিয়ম করে ব্যবহারে ব্রণ কমে যাবে।

পরিশেষে,

ব্রণ এমন একটা রোগ যা মানুষের সৌন্দর্য হানি করে। ব্রণের কারণে দাগ ও গর্ত তৈরি হয় যা আরো ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করে। তাই একটু সচেতন ও বুদ্ধি দ্বারা ব্রণের নির্মূল সম্ভব।

।। আপনাদের মতামত অথবা কোন প্রশ্ন থাকলে তা অবশ্যই কমেন্ট বক্সে লিখতে ভুলবেন না। আমরা যথাসম্ভব চেষ্টা করবো সমাধান দেয়ার জন্য।।