জ্বর কী? কেন হয়? উপসর্গ বা লক্ষণ গুলো কী কী? চিকিৎসা ও প্রতিকার কিভাবে সম্ভব?

0
100
fever home remedy

প্রথমেই বলে রাখি জ্বর আসলে কোন রোগ নয় বরং এটি অন্য কোন রোগের উপসর্গ মাত্র। অর্থাৎ শরীরে অন্য কোন রোগের আগমন ঘটতে পারে এজন্যই জ্বর হয়ে থাকে। তবে কিছু কিছু জ্বর ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে হয়ে থাকে আবার কিছু কিছু জ্বর প্রকৃতির পরিবর্তনের কারণেও হয়।

জ্বর

জ্বর হলে মানুষের দেহের স্বাভাবিক  তাপমাত্রা বেড়ে যায়। সাধারণত মানুষের দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রা ৯৮.৬ ফারেনহাইট। এর থেকে তাপমাত্রা যদি বেড়ে যায় তবে তাকেই আমরা জ্বর বলতে পারি। জ্বর হলে থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর পরিমাপ করা হয়।

জ্বরের প্রকারভেদ

জ্বর বিভিন্ন প্রকারের হয়ে থাকে। যেমন,

  • একটানা জ্বর
  • নির্দিষ্ট বিরতিতে জ্বর
  • স্বল্প বিরতিতে জ্বর
  • দীর্ঘ বিরতিতে জ্বর
  • তরাঙ্গায়িত জ্বর

তবে সাধারণ ভাবে জ্বরকে ৩ ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন,

১. কন্টিনিউড

২. রেমিটেন্ড

৩. ইন্টারমিটেন্ড

 জ্বর হওয়ার কারণ

জ্বর বিভিন্ন কারণে হয়ে থাকে। অনেক সময় বড় ধরনের রোগের পূর্ব লক্ষণ হিসেবে ও জ্বর হয়ে থাকে। এছাড়াও বিভিন্ন ইনফেকশনজনিত কারণ, ভাইরাসের সংক্রমণের কারণেও জ্বর হতে পারে। নিম্নে জ্বর হওয়ার কিছু কারণ তুলে ধরলাম।

১. ভাইরাসজনিত কারণে জ্বর হয়ে থাকে। যেমন, সর্দি, কাশি, হুপিংকাশি, ডেঙ্গু জ্বর ইত্যাদি।

২. যেকোন ধরণের ইনফেকশন বা পুঁজ জনিত ইনফেকশনের কারণে জ্বর হয়ে থাকে। যেমন, ফোড়া,

৩. দীর্ঘদিন যাবত কোন প্রদাহ বা ক্রনিক ইনফেকশনে ভুগলে জ্বর হয়ে থাকে। যেমন, যক্ষা রোগ।

৪. পরজীবির প্রভাবে জ্বর হতে পারে। যেমন, ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া ইত্যাদি।

৫. ঋতু বা আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণেও অনেক সময় জ্বর হয়ে থাকে।

৬. প্রস্রাবে বা প্রস্রাবের নালীতে ইনফেকশনের কারণে জ্বর হয়।

৭. বড় কোন অপারেশন হলে জ্বর হয়।

৮. কোন স্থানে ব্যথা পেলে বা কেঁটে গেলে জ্বর হয়।

৯. ক্যান্সার হলে ঘন ঘন জ্বর হয়।

১০. মহিলা বা পুরুষের জনতন্ত্রের প্রদাহ জনিত কারণে জ্বর হয়।

উপরোক্ত কারণ গুলো ছাড়াও আরো অনেক কারণে জ্বর হয়ে থাকে।

 জ্বরের লক্ষণ

জ্বর হলে শরীরে কিছু লক্ষণ দেখা যায়। কমবেশি সবাই এসব লক্ষণ গুলো সাথে পরিচিত হয়ে থাকে। জ্বরের লক্ষণ গুলো হলো,

  • অবসন্নতা
  • ক্ষুধামন্দা
  • মাথাব্যথা
  • ঘুম ঘুম ভাব
  • শরীর মেজ মেজ করা
  • মনোযোগ নষ্ট হওয়া
  • বমি বমি ভাব
  • শীত শীত ভাব লাগা
  • নাক দিয়ে পানি পড়া
  • চোখ দিয়ে পানি পড়া
  • চ্লকানি
  • অস্থিরতা
  • তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া।

এছাড়াও আরো অনেক লক্ষণ থাকতে পারে। যেসব লক্ষণ দেখলেই আপনি বুঝতে পারবেন আপনার জ্বর হয়েছে।

 জ্বর কোন কোন রোগের বহিঃপ্রকাশ

জ্বর নিজে কোন রোগ নয় এটা অন্য যেকোন রোগের পূর্ব লক্ষণ মাত্র। আসুন জেনে নেই জ্বর আসলে কোন কোন রোগের আগমন ঘটাতে পারে।

টাইফয়েড

টাইফয়েড জ্বর সালমোলেনা টাইফি নামক ব্যাকটেরিয়ার ইনফেকশনের কারণে হয়ে থাকে। এ জ্বর ভালো হতে ২০ দিন সময় লাগে কোন রকম চিকিৎসা ছাড়াই। এ জ্বর নির্ণয়ের জন্য রক্তের ভিডাল টেস্ট করানো হয়।

প্যারাটাইফয়েড

প্যারাটাইফয়েড জ্বর সালমোলেনা প্যারাটাইফি ইনফেকশনের কারণে হয়ে থাকে। এই জ্বর রক্তের ভিডাল টেস্ট বা ব্লাড কালচারের মাধ্যমে সনাক্ত করা হয়।

ম্যালেরিয়া

ম্যালেরিয়া জ্বর হয় প্লাজমোডিয়াম প্যারাসাইটিক ইনফেকশন কারণে। এনোফিলিস মশার কামরে সাধারণত এই জ্বর হয়ে থাকে। আইসিটি মেথডের মাধ্যমে বর্তমানে খুব কম সময়ে রক্তে ম্যালেরিয়া আছে কিনা তা ধরা হয়।

ডেঙ্গু

ডেঙ্গু জ্বর হয় এডিস মশার কামর থেকে। ডেঙ্গু জ্বরে রক্তে প্লাটিলেট কাউন্ট কমে যেতে পারে। সঠিক চিকিৎসার অভাবে রোগি মারা ও যেতে পারে।

কালাজ্বর

কালাজ্বর লেইশমেনিয়া ডনোভানি প্যারাসাইটের ইনফেকশনের কারণে হয়ে থাকে। এই জ্বর হয় বালুমাছির কামরের কারণে। এ জ্বরে শরীর কালচে হয়ে যায়। আইসিটি মোথডে এই জ্বর ডিটেক্ট করা হয়।

বাতজ্বর

বাতজ্বর সাধারণত গলায় গ্রুপে স্ট্রেপ্টোকক্কাস ইনফেকশনের কারণে হয়ে থাকে। এ জ্বরে জয়েন্টে জয়েন্টে ব্যাথা করে। থ্রট কালচার টেস্টের মাধ্যমে জানা যায় ইনফেকশন আছে কিনা।

প্রস্রাবে ইনফেকশন

প্রস্রাবে যদি ইনফেকশন থাকে তাহলেও জ্বর হয়। ইউরিন কালচারের মাধ্যমে এ জ্বর সনাক্ত করা হয়।

জন্ডিস জ্বর

হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি, ও ই ভাইরাসের কারণে লিভার আক্রান্ত হয়ে জন্ডিস জ্বর হয়। আইসিটি ও এলাইজা মেথডে এ ভাইরাস সনাক্ত করা যায় সহজেই।

 সনাক্তকরণ পদ্ধতি

জ্বর বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। কি জ্বর হয়েছে তা সনাক্ত করার জন্য অনেক গুলো টেষ্ট ডাক্তার দিয়ে থাকে। টেস্ট গুলোর মাধ্যমে বুঝা যায় কী জ্বর হয়েছে এবং এতে করে চিকিৎসা করতে সুবিধা হয়।

জ্বর হলে সনাক্তকরার জন্য যেসব টেস্ট করা হয় তা হলে,

  • রক্তের সাধারণ টেস্ট টিসি, ডিসি, ইএসআর।
  • এক্সরে চেস্ট।
  • সিটিস্ক্যান বা এমআরআই।
  • যক্ষ্মার জন্য পিসিআই, এএফবি, কালচার সেনসিটিভিটি।
  • Widal test.
  • Febrile Antigen.
  • জন্ডিস জ্বরের ক্ষেত্রে আইসিটি ও এলাইজা মেথডে রক্ত পরীক্ষা করা হয়।
  • ডেঙ্গু জ্বরের জন্য এনএসওয়ান ও র‍্যাপিড টেস্ট করানো হয়।

এসব টেস্ট ছাড়াও ডাক্তার প্রয়োজন অনুযায়ী অনেক টেস্টের মাধ্যমে জ্বরের ধরণ সনাক্ত করতে পারে।

চিকিৎসা

জ্বর নিজে কোন রোগ নয়। জ্বর হলে ঘাবড়ে না গিয়ে কীভাবে এর প্রতিরোধ করা যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। সাধারণত ১০৩ ডিগ্রি জ্বর হলে সেটাকে মাঝারি জ্বর বলে এর বেশি হলে সেটাকে উচ্চ জ্বর বলে। ১০৪ ডিগ্রির বেশি জ্বর হলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। জ্বরের সাথে মাথাব্যাথা, শরীর ব্যথা, পেট ব্যথা, বমি, বুকে ব্যথা, শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হলে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। প্রয়োজনে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিতে  হবে।

প্রতিরোধ ব্যবস্থা

জ্বর হলে ঘাবড়ে না গিয়ে নিজেই ঘরে বসে কিছু প্রস্তুতি নেয়া যেতে পারে। এতে করে জ্বর মারাত্মক আকার ধারণ করে না। জ্বর হলে যেসব প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে তা নিচে আলোচনা করা হলো,

  • পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশ্রাম নিতে হবে।
  • শরীরে বেশি কাপড় রাখা যাবে না।
  • কাথা, কম্বল যথাসম্ভব কম দেয়ার চেষ্টা করবেন।
  • পুরো শরীর বার বার স্পঞ্জ বা মুছতে হবে কুসুম গরম পানি দিয়ে।
  • গোসল করতে হবে।
  • মাথায় জ্বর বেশি হলে পানি ঢালতে পারেন।
  • বাতাসের মধ্যে থাকার ব্যবস্থা করতে হবে।
  • প্রচুর পরিমানে পানি, শরবত, ডাবের পানি খেতে হবে।
  • বেশি জ্বর হলে অন্য কোন ঔষধ না খেয়ে শুধু প্যারাসিটামল খেতে পারেন।
  • ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষুধ সেবন করুন।

জ্বরে ঘাবড়ে না গিয়ে শান্ত থেকে উপরের নিয়ম গুলো যথাযথ পালন করার চেষ্টা করবেন।

জ্বর হলে বর্জনীয়

জ্বর হলে কী করবেন তা জানার সাথে সাথে কী করবেন না তাও জানতে হবে। নিচে কী করা উচিত নয় এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হলো,

  • জ্বর হলে শরীর বেশি ঢেকে রাখা যাবে না।
  • রুমের দরজা জানাল বন্ধ করে আঁটসাঁট করে রাখা যাবে না।
  • প্যারাসিটামল ডাবল খাওয়া যাবে না।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঔষুধ খাওয়া যাবে না।

জ্বর হলে কিছু নিয়ম মেনে চলার মাধ্যমে তা দ্রুত নিরাময় সম্ভব হয়।

জ্বরের খাবার

জ্বর হলে যেসব খাবার খাওয়া উপকারী সেসব খাবারের নাম নিচে দেয়া হলো,

  • চিকেন স্যুপ।
  • সবজী স্যুপ।
  • লাল চা।
  • নরম খাবার।
  • প্রচুর পরিমানে পানি।
  • শরবত।
  • ডাবের পানি।
  • আনারস।
  • কমলালেবু।
  • আদা, রসুন।
  • কিসমিস।
  • ভিটামিন-এ ও ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ খাবার।

জ্বর হলে অবশ্যই কিছু কিছু খাবার নিয়ম অনুয়ায়ী খেতে হবে। উপরের খাবার গুলো ছাড়াও আরো অনেক পুষ্টিকর খাবার জ্বর হলে অবশ্যই খাবেন।

জ্বর হলে যেসব খাবার বর্জনীয়

জ্বর হলে অনেক খাবার খাওয়া উচিৎ না। খাবার গুলো হলো,

  • অতিরিক্ত  ভাজা পোড়া।
  • অতিরিক্ত তৈলাক্ত খাবার।
  • চা-কফি।
  • কোল্ড ড্রিংকস।
  • অ্যালকোহল জাতীয় খাবার।
  • শক্ত খাবার।

এছাড়াও আরো অনেক খাবার আছে যা জ্বর হলে না খাওয়াই ভালো।

জ্বর এমন একটি রোগ যা অন্য রোগের ইঙ্গিত দিয়ে থাকে। জ্বর হলে এবং জ্বরের ধরণ অনুযায়ী অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়ার চেষ্টা করতে হবে। অনেক সময় জ্বর অন্য রোগের প্রতিরোধ হিসেবে হয়ে থাকে। জ্বর হলে অবহেলা মোটেই করা উচিৎ নয়।

★★মনে রাখবেন একটু সচেতনতা আমাদেরকে বিশাল বড় বিপদ থেকে রক্ষা করতে পারে। আর অবশ্যই রোগ বালাই হলে আপনার সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে ভুলবেন না। ★★

আপনাদের মতামত অথবা কোন প্রশ্ন থাকলে তা অবশ্যই কমেন্ট বক্সে লিখতে ভুলবেন না।